
আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ নানা ইস্যুতে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠছে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন। নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের নিষ্ক্রিয় অবস্থানহেতু দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি দ্রুত জাতীয় নির্বাচন প্রশ্নে নিজেদের অবস্থান জোরাল করছে। গত কয়েকদিনে দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের বক্তব্যে এমনি আভাস মিলেছে।
সবশেষ গতকাল খুলনায় এক অনুষ্ঠানে বেশ কড়া ভাষায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন আহমেদ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা, ২ ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগসহ দ্রুত নির্বাচন দেওয়ার দাবি তুলেছেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির এই সদস্য বলেন, ‘আপনার নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থান পর অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু মনে করবেন না রোজ কেয়ামত পর্যন্ত আপনাদের আমরা এ জায়গায় দেখতে চাইব। এখন মানুষ আপনার সরকারকে বলছে এনসিপি মার্কা সরকার। আপনার সরকারে এনসিপির দুজন প্রতিনিধি বিদ্যমান। তারা উপদেষ্টা, আবার এনসিপি সংগঠন করেন। অফিশিয়ালি করেন না, কিন্তু সবাই সবকিছু জানে। ওপেন সিক্রেট। যদি আপনি নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে চান, তাহলে এনসিপি মার্কা সেই দুজনকে পদত্যাগ করতে বলেন। যদি তারা পদত্যাগ না করেন, আপনি বিদায় করুন।’
প্রধান উপদেষ্টার উদ্দেশে সালাহউদ্দিন আহমদ আরো বলেন, ‘আপনি কি চান নির্বাচনের জন্য আপনার সঙ্গে আমাদের কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব সৃষ্টি হোক? এ দেশের জনগণ যমুনামুখী লংমার্চ করুক? হুঁশিয়ার করে দিতে চাই প্রফেসর ড. ইউনূস সাহেব, আপনি বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তিত্ব, সম্মানিতজন। আপনি সম্মানের সঙ্গে বাংলাদেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের আয়োজন করুন ডিসেম্বরের মধ্যে, যে কথা আপনি আমাদের দিয়েছিলেন। সংস্কার এবং বিচার একটি চলমান প্রক্রিয়া। যারাই সরকারে আসুক, এটি চালু থাকবে। অনন্তকাল ধরে আপনি বিচার এবং সংস্কারের বাহানা দিয়ে দেশের গণতন্ত্রকে কণ্টকাকীর্ণ করবেন না।’
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা সম্পর্কে ঘোরতর আপত্তি জানিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘একজন বিদেশী নাগরিককে আপনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা করেছেন। আপনার কি সেই আক্কেলজ্ঞান নাই? একজন বিদেশী নাগরিকের কাছে সেনাবাহিনী নিরাপত্তাসংক্রান্ত রিপোর্ট দেবে কীভাবে ভাবলেন? তিনি রোহিঙ্গা করিডোরের নামে, মানবিক করিডোরের নামে বাংলাদেশকে যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করতে চান। বাংলাদেশের মানুষের সঙ্গে আপনি কথা বলেননি।’
অপরদিকে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান গত এক সপ্তাহে একাধিক অনুষ্ঠানে দেওয়া ভার্চুয়াল বক্তৃতায় রাখাইনের জন্য করিডর ও চট্টগ্রাম বন্দরের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার বিষয়ে আপত্তি জানিয়ে বলেছেন, এটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কাজ নয়। জনগণ এই সরকারকে এমন দায়িত্ব দেয়নি।
অনুরূপভাবে, বিএমপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী; সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রমুখ নির্বাচনের অভিন্ন দাবিতে সোচ্চার থেকেছেন। বিএনপি নেতাদের বক্তব্যে এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, দলটি নির্বাচনের দাবিতে অপেক্ষাকৃত নরমপন্থা থেকে বেরিয়ে আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।
বিশেষ করে, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছুরিকাঘাতে ছাত্রদল নেতার মৃত্যু ও দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত-বিএনপি সংঘর্ষ এবং বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের অনিরপেক্ষ অবস্থান বিএনপির ক্ষোভ ও অবিশ্বাসকে ক্রমাগত বাড়িয়েই তুলেছে। এক সময়ের রাজনৈতিক ও নির্বাচনী জোটের মিত্র জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির বর্তমান সম্পর্ক এক রকম সাপেনেউলে রূপ নিচ্ছে। বিএনপি নেতা হাবিবুর রহমান বলেই ফেলেছেন যে, ‘জামায়াত-শিবির মোনাফেক। এদের পেছনে নামাজ হবে না।’
অন্যদিকে, রাজনীতির মাঠে কার্যত কোণঠাসা নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ সমমনা বাম রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে বিএনপির সরাসরি ঐক্য স্থাপিত না হলেও নির্বাচন প্রশ্নে তাদের অভিন্ন অবস্থান রয়েছে। তার মানে সামনে নির্বাচন ইস্যুতে কঠোর আন্দোলন কর্মসূচি ঘোষণা করা হলে বিএনপি অপরাপর দলগুলির সমর্থন স্বাভাবিকভাবেই লাভ করবে।
অবস্থাদৃষ্টে এটি প্রতীয়মান হচ্ছে যে, আগামী কয়েক সপ্তাহে দেশের রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বাড়বে। এতে সংকটে থাকা দেশের অর্থনীতি ও নাজুক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নির্বাচন প্রশ্নে রাজনৈতিক সংকটের সমাধান না হলে অনেক বিশ্লেষকের মতে, দেশ এক অনিশ্চত গন্তব্যের দিকে যাত্রা করবে।







































