
রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য গঠিত ছয়টি কমিশন ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে। তবে পরে আরও যে চারটি কমিশনের প্রধানের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, ওই চারটি কমিশনের গেজেট এখনও প্রকাশ হয়নি। গেজেট প্রকাশ হওয়ার পর তাদের কাজ শুরু হবে।
প্রধান উপদেষ্টার ডেপুটি প্রেস সচিব আজাদ মজুমদার বলেছেন, “আগে যে ছয়টি কমিশন হয়েছে, তারা গেজেট প্রকাশের পরই কাজ শুরু করেছে। আর বাকি চারটি কমিশনের প্রধানদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ কমিশনের গেজেট কয়েক দিনের মধ্যেই হবে।”
৩ অক্টোবর পাঁচটি কমিশনের পূর্ণাঙ্গ গেজেট প্রকাশ করা হয়। সেগুলো হলো- বিচার বিভাগ, পুলিশ, জনপ্রশাসন, নির্বাচন ও দুর্নীতি দমন কমিশন। ৭ অক্টোবর গেজেট প্রকাশ করা হয় সংবিধান সংস্কার কমিশনের। প্রথমে এই কমিশনের প্রধান করা হয়েছিল ড. শাহদীন মালিককে। পরে তার পরিবর্তে কমিশন প্রধান করা হয় অধ্যাপক আলী রীয়াজকে। শাহদীন মালিক এখন আর কমিশনেই নেই।
১৭ অক্টোবর আরও চারটি কমিশন করার কথা ও প্রধানদের নাম জানান উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। সেগুলো হলো- স্বাস্থ্য কমিশনের প্রধান জাতীয় অধ্যাপক ডা. এ কে আজাদ খান, গণমাধ্যম কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ, শ্রমিক অধিকার কমিশনের প্রধান সৈয়দ সুলতানউদ্দিন আহমেদ এবং নারী বিষয়ক কমিশনের প্রধান শিরিন পারভীন হক।
শিরিন পারভীন হক বলেন, “আমি এখনও বিস্তারিত কিছু জানি না। কমিশনের অন্য সদস্য কারা হবেন তা-ও জানি না। আমাকে টার্মস অব রেফারেন্সসহ বিস্তারিত জানালে কাজ শুরু করতে পারব। তার আগে কিছু করতে পারছি না।”
এই চারটি কমিশনও স্ব স্ব ক্ষেত্রে সংস্কারের সুপারিশ করবে।
প্রত্যেকটি কমিশনের মেয়াদ গেজেট প্রকাশের দিন থেকে ছয় মাস। কমিশন প্রধান এবং সদস্য পূর্ণকালীন হিসেবে কমিশনে কাজ করছেন। এই সময়ে তারা অন্য কাজ থেকে বিরত থাকবেন। তাদের কাজের জন্য অফিস এবং সাচিবিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তারা প্রতিবেদন দেবেন প্রধান উপদেষ্টাকে।
কমিশন যেভাবে এগোচ্ছে
গেজেট হওয়া ছয়টি কমিশনের সদস্যদের সঙ্গেই কথা বলেছে ডয়চে ভেলে। তাদের সঙ্গে কথা বলে স্পষ্ট হয়েছে যে, প্রতিটি কমিশনই তাদের নিজেদের মধ্যে বৈঠক এবং আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে কাজ এগিয়ে নিচ্ছে। তারা তাদের কাজের জন্য কমিশনের সদস্যদের বাইরের বিশেষজ্ঞদের পরামর্শও নিচ্ছেন। এর বাইরে তারা সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করবেন। কয়েকটি কমিশন ওয়েব সাইটও চালু করছে। ওই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে তারা দেশের সাধারণ মানুষকেও মতামত দেওয়ার সুযোগ করে দেবেন।
নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশন নির্বাচন কমিশনে বসেই তাদের কাজ করছে। কমিশনের সদস্য অধ্যাপক ড. জাহেদ উর রহমান বলেন, “আমরা তো ফুলটাইম কাজ করছি। প্রতিদিনই আমাদের বৈঠক হচ্ছে। আমরা প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট সংগ্রহ করছি। প্রচলিত আইন বিধি দেখছি। আমাদের মধ্যে ভিন্নমত আছে। আমরা নিজেদের মধ্যেও বিতর্ক করছি। এর মধ্য দিয়ে আমরা একটা প্রাথমিক সুপারিশ তৈরি করে তারপর আরও কাজ করব। তার ওপর ভিত্তি করে আমাদের সুপারিশ পেশ করব।”
তার কথা, “এটা শুধু নির্বাচন কমিশন সংস্কার নয়। আমাদের কাজ হলো নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারের সুপারিশ করা। অনেকে মনে করেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। আসলে পুরো কাজ করতে হলে সংবিধান, আইনের পরিবর্তন করতে হবে। আমরা এই সব কিছু নিয়েই কাজ করছি। আমাদের লক্ষ্য হলো, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা।”
তিনি জানান, তারা এ নিয়ে নাগরিক সমাজের সঙ্গেও মত বিনিময় করবেন। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেবেন। আর একটি ওয়েবসাইট খুলছেন, যেখানে দেশের মানুষ তাদের মতামত দিতে পারবেন। সেগুলোও তারা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবেন।
পুলিশ সংস্কার কমিশনের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক শাহনাজ হুদা বলেন, “আমরা আশা করছি, একটি জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী তৈরি করার জন্য আমরা ভালো একটি সুপারিশ করতে পারব। কমিশনে যারা আছেন, তারা সবাই অভিজ্ঞ। তারা পুলিশ নিয়ে অতীতে অনেক কাজ করেছেন। তারা গুরুত্বপূর্ণ মতামত দিচ্ছেন।”
“আমরা ইতোমধ্যে অনেকগুলো বৈঠক করেছি। আমরা বাইরে থেকেও যারা বিশেষজ্ঞ, তাদের মতামত নিচ্ছি। মতবিনিময় করবো। সাধারণ মানুষের মতামতও নেব। এটা একটা বিশাল কাজ। চেষ্টা করছি নির্ধারিত তিন মাসের মধ্যেই কাজ শেষ করতে। সেজন্য একটা প্রাথমিক ড্রাফট করে তার ওপর আবার আমরা আলোচনা করবো, তথ্য নেব, মতামত নেব, তারপর চূড়ান্ত করবো। আমাদের টার্গেট হলো পুলিশকে জনগণের পুলিশ করার মতো একটা সুপারিশ করা।”
আর জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এ কে এম ফিরোজ আহমেদ বলেন, “আমরা এখন পর্যন্ত একটি বৈঠক করেছি। আগামী বুধবার আরেকটি বৈঠক হবে। ফলে এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। আমরা আরও কয়েকটি বৈঠক করলে বুঝতে পারবো আমরা কোন জায়গায় আছি, কোন দিকে যাব।”
বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনও এরই মধ্যে বেশ কয়েটি বৈঠক করেছে বলে জানান কমিশন সদস্য, সাবেক বিচারক ও আইনজীবী মাজদার হোসেন, “আমরা প্রায় প্রতিদিনই বৈঠক করছি। নিজেদের মধ্যে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করছি। তবে এখন বিস্তারিত কিছু বলা যাবে না। তবে আমরা ভালো কিছু একটা করতে চাই।”
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ড. শরীফ ভুঁইয়া বলেন, “আমাদের একটা মিটিং ১৩ অক্টোবর হয়েছে। আর আরেকটা মিটিং ২১ অক্টোবর হবে। এর বাইরে এখন আর কিছু বলা যাবে না। আমাদের কাজের অগ্রগতি পরে প্রেস ব্রিফিং করে জানাব।”
আর দুর্নীতি সংস্কার কমিশনের সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক মোবাশ্বের মোমেন কমিশনের কাজ শুরু হওয়ার কথা জানালেও বিস্তারিত কিছু বলেননি।
প্রসঙ্গত, ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্র সংস্কার। আর সেই সংস্কারের জন্যই এখন পর্যন্ত ১০টি কমিশন গঠন করা হয়েছে।







































