
নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে কোনো কোনো কোম্পানি আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস ‘আদার ইনকাম’ হিসেবে আয়-ব্যয়ের হিসাবে দেখাচ্ছে। কিছু কোম্পানি নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস অন্তর্ভুক্তই করছে না। এ বিষয়ে দেশের হিসাব আইনেও নেই কোনো নির্দেশনা।
এ সুযোগ নিয়ে কিছু কোম্পানি সুবিধামতো হিসাব তৈরি করতে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস ‘আদার ইনকাম’ নামে অন্তর্ভুক্ত করছে, আবার কিছু কোম্পানি অন্তর্ভুক্ত করছে না। বিশেষ করে লোকসান হলে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে তা হিসাবে নেওয়া হচ্ছে না। বিপরীতে মুনাফা হলে তা অন্তর্ভুক্ত করে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয় করা হচ্ছে। এর মাধ্যমে কোম্পানি নিট মুনাফা বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ পায়। অন্যভাবে বলা যায় ইপিএস (শেয়ারপ্রতি আয়) বাড়িয়ে দেখানোর সুযোগ পাওয়া যায়।
হিসাববিদরা বলছেন, আন্তর্জাতিক হিসাব মান বা ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং স্ট্যান্ডার্ড (আইএফআরএস) অনুযায়ী লাভ-লোকসান হিসাবে আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস দেখানো বাধ্যতামূলক। কিন্তু বাংলাদেশে আইএফআরএস পুরোপুরি মানা হয় না এবং আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কি না সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।
তারা বলছেন, আইনে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা না থাকায় কোম্পানি তার সুবিধামতো নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয় করতে পারছে। আর্থিক প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে আইনের এই ফাঁক বন্ধ করা উচিত। এজন্য সুনির্দিষ্ট একটি গাইডলাইন তৈরি করে দেওয়া যেতে পারে। নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে সব কোম্পানিকেই একই নিয়ম অনুসরণ করতে হবে। ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি) থেকে এই গাইডলাইন তৈরি করে দিতে পারে।
শেয়ারবাজারে ‘গ্যাম্বলিং শেয়ার’ হিসেবে পরিচিত ফরচুন সুজ এবং সোনালী পেপারের সবশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনা করতে গিয়ে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ‘আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস’ অন্তর্ভুক্ত করা বা না করার বিষয়টি সামনে আসে।
শেয়ার ব্যবসার রিয়েলাইজড ও আনরিয়েলাইজড লাভ এবং লোকসান অন্তর্ভুক্ত করে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয় করেছে সোনালী পেপার। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারে বিনিয়োগ করে মোটা অংকের মুনাফা করেছে। কোম্পানিটির সবশেষ প্রকাশিত আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসের ব্যবসায় নিট মুনাফা হয়েছে ১৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে শেয়ার ব্যবসা থেকেই মুনাফা হয়েছে ১৩ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সোনালী পেপারের কোম্পানি সচিব মো. রাসেদুল হোসাইন বলেন, ‘আমাদের তো বার্ষিক অডিট হয়। অডিটররা তো এ বিষয়ে কোনো আপত্তি দেয়নি। তাদের গাইডলাইন আমরা ফলো করি।’
অপরদিকে নিট লাভ বা লোকসান নির্ণয়ের ক্ষেত্রে ফরচুন সুজ শেয়ার ব্যবসার লাভ বা লোকসানের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করেনি। প্রতিষ্ঠানটি লাভ-লোকসান হিসাবে ‘আদার কম্প্রিহেনসিভ ইনকাম’ নামে শেয়ারে বিনিয়োগ সংক্রান্ত লোকসানের বিষয়টি নিট মুনাফা নির্ণয়ের পর দেখিয়েছে। অর্থাৎ ইপিএস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে শেয়ারে বিনিয়োগজনিত লোকসান বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। প্রতিষ্ঠানটি শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে বড় লোকসানে রয়েছে।
ফরচুন সুজ সবশেষ ২০২৩ সালের জুলাই থেকে চলতি বছরের মার্চ পর্যন্ত নয় মাসের আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, নিট মুনাফা হয়েছে ২০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। বিপরীতে শেয়ারে বিনিয়োগ করে আনরিয়েলাইজড লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৮ কোটি ১২ লাখ টাকা। অর্থাৎ শেয়ার ব্যবসার এই লোকসান হিসাবে নিলে কোম্পানিটির মুনাফার পরিমাণ দাঁড়ায় মাত্র ২ কোটি ২৭ লাখ টাকা। সেক্ষেত্রে ইপিএস হতো মাত্র ১৩ পয়সা। কিন্তু কোম্পানিটি এই লোকসান অন্তর্ভুক্ত না করায় ইপিএস দেখানো হয়েছে ১ টাকা ২০ পয়সা।
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে ফরচুন সুজের কোম্পানি সচিব রিয়াজউদ্দিন ভুঁইয়া বলেন, ‘শেয়ার ব্যবসার বিষয়টি আগে আমরা নেটিং করে দেখাতাম। কিন্তু অডিটর ও বিএসইসি (বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন) আপত্তি তোলে। যে কারণে দুই বছর ধরে আমরা নিটিং করে দেখাচ্ছি না। প্রফিট (মুনাফা) রিয়েলাইজড না করার কারণে আমি দেখাতে পারিনি। তাহলে যে লোকসান আমি রিয়েলাইজড করিনি, সেটি দেখাবো কী করে? তারপরও যদি পদ্ধতিগত ভুল থাকে আমরা সংশোধন করে নেবো।’
এফসিএ, এফসিএমএ, সিআইএসএ, এফসিএস সিআইপিএফএ (ইউকে) ডিগ্রিধারী হিসাববিদ মো. মনোয়ার হোসেন বলেন, ‘ইপিএস নির্ণয়ের ক্ষেত্রে আনরিয়েলাইজড লাভ বা লোকসান অন্তর্ভুক্ত করতে হবে কি হবে না, সে বিষয়ে আমাদের দেশে সুনির্দিষ্ট কোনো গাইডলাইন নেই। যে কারণে একেক কোম্পানি একেক রকম হিসাব দেখায়। তবে আমি মনে করি সবার জন্য এক নিয়ম হওয়া উচিত। এক্ষেত্রে এফআরসি একটি গাইডলাইন তৈরি করে দিতে পারে, যেটি সবাই ফলো করবে।’
দ্য ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) সহ-সভাপতি এবিএম লুৎফুল হাদী বলেন, ‘আইএফআরএস অনুযায়ী প্রফিট অ্যান্ড লস অ্যাকাউন্টে আনরিয়েলাইজড গেইন বা লস ‘আদার ইনকাম’ নামে অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু আমাদের দেশে আইএফআরএস পুরোপুরি মানা হয় না।’
আনরিয়েলাইড গেইন বা লস অন্তর্ভুক্ত করলে বা না করলে কী ধরনের অপরাধ হবে? এমন প্রশ্ন করলে এবিএম লুৎফুল হাদী বলেন, ‘আদার ইনকাম’ নামে অন্তর্ভুক্ত করে দেখালে ভালো। না দেখালেও সমস্যা নেই। সুতরাং কেউ যদি অন্তর্ভুক্ত না করে তাতে অপরাধ হবে না।’
যোগাযোগ করা হলে এফআরসির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মানজারুল মান্নান বলেন, ‘আমি প্রফেশনাল (হিসাববিদ) না। তবে আপনি যেহেতু বলছেন, আমরা বিষয়টি দেখবো। যদি আমাদের আইনে এ বিষয়ে না থাকে, তাহলে আমরা প্রয়োজন অনুযায়ী গাইডলাইন করে দেবো। কিন্তু ইচ্ছামতো হিসাব করা যাবে না।’







































