
'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' যেটা আন্দোলন কেন্দ্রীক প্ল্যাটফর্ম হলেও বর্তমানে এটিকে ব্যবহার করে আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগকে পূর্নবাসন করা হচ্ছে। যদিও এর জন্য জেলা পর্যায়ের ব্যক্তিবর্গ জড়িত। জেলা পর্যায়ে কমিটি না থাকলেও সারাদেশে স্বঘোষিত সমন্বয়কের অভাব নাই, আবার নিজেরা প্রিন্ট করে প্রকাশ করেছে এমন কমিটিও রয়েছে অহরহ। আ.লীগের সাথে অপকর্মের দায়ে যাদের পালিয়ে বেড়ানোর কথা তারা সংগঠনটির নাম ব্যবহার করে গর্জন দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, সাথে বিভিন্ন নামে অর্থ উত্তোলন তো আছেই। এ যেনো ডালের সাথে তরকারি ফ্রি।
নিউজে দেখলাম বরগুনায় ছাত্রলীগের এক নেতার দ্বারা 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন' ব্যানারটি ব্যবহার হচ্ছে এবং আওয়ামী লীগের লোকজনকে পূর্নবাসিত করছে। যার দরুণ দুই পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট, চাঁদপুর, ময়মনসিংহ, খাগড়াছড়ি, বগুড়া, ঝিনাইদহ, শরীয়তপুর সহ দেশের প্রায় প্রতিটি স্থানেই দেখলাম একই বিষয়ের জেরে হাতাহাতির ঘটনা। বিষয়গুলোর অন্যতম কারণ হচ্ছে কোটা সংস্কার আন্দোলন ও সরকার পতনের আন্দোলন। আওয়ামী পরিবারের অনেকে ছিলো যারা নেত্রীর প্রশ্নে আপোষহীন, তারা সরকার পতনের আন্দোলনের বিরোধীতা করেছে। অথচ ৫ আগস্ট দেশ স্বৈরাচার হবার পর থেকেই তাদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে সবচেয়ে বেশি এবং তাদের সমন্বয়ক হবার খায়েশও তাদেরই। যার দলে আন্দোলনকারীদের মধ্যে দুই পক্ষ হয়ে গেছে। বিশেষ করে জেলা, উপজেলা পর্যায়ে সরকার পতনের আন্দোলনকারীরা নিগৃহীত হচ্ছে আওয়ামী পরিবারের কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের দ্বারা। যার প্রমাণ আমার নিজ জেলা নাটোরেও পেয়েছি।
আবার অনেকে ৩, ৪ আগস্ট ছাত্রলীগের সাথে পিকেটিং এ জড়িত ছিলো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ নিজ দলের লোকজনের গুলিতে আহত হয়েছে। আহত হবার পরেই তাদের পরিচয় পাল্টে আন্দোলনকারী হয়ে গেছে। আন্দোলনকারী পরিচয়ে তারা এখন সুযোগ সুবিধা নিতে ব্যতিব্যস্ত। বিষয়গুলো প্রকৃত আহত আন্দোলনকারীদের জন্য লজ্জার, বিব্রতকর। একটু খেয়াল করলেই দেখবেন সব সময়ই সুবিধাবাদীরা চাটুকারিতার দৌঁড়ে এগিয়ে থাকে। আবার বিভিন্ন জায়গায় চলছে অর্থ উত্তোলনের খেলা। সমন্বয়ক পরিচয়ে জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অনৈতিক সুবিধা নেওয়ার কথাও জানা যাচ্ছে। টিসিবি, ওএমএসএস ইত্যাদি ডিলারশিপের দায়িত্বে থাকা পূর্বের লোকজনের থেকে অর্থ উত্তোলন এবং তাদেরকে সুবিধা করে দেওয়া বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
আন্দোলনের সময় সকল দল, ধর্ম, বর্ণের মানুষ অংশ নিলেও এখন তাদের রাজনৈতিকভাবে বিবেচিত হচ্ছে। যা নিয়ে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের মধ্যেও পরস্পরবিরোধী বক্তব্য লক্ষ্য করা যাচ্ছে। পরস্পরবিরোধী হবার অবশ্য যথেষ্ট কারণ আছে, কেননা সমন্বয়কদের মধ্যে অনেকের পরিবার বিএনপি, জামায়াত, আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে যুক্ত, কেউ কেউ গণ অধিকার পরিষদের রাজনীতির সাথে যুক্ত। যার ফলে মত বিরোধ থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে, কিছু সমন্বয়কদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্যে রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হচ্ছে, যাতে স্পষ্টত ভুক্তভোগী হচ্ছে তৃণমূল পর্যায়ের কর্মীরা। বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতাদের বিরুদ্ধে আক্রমণাত্মক, ব্যাঙ্গাত্মক ভাষায় তীর ছোড়া মোটেও শোভনীয় মনে হচ্ছেনা। বিষয়গুলো নিয়ে বিচার, বিশ্লেষণ না করার কারণে সংকট তীব্র আকার ধারণ করছে।
সেদিন একজন সমন্বয়কের বক্তব্যে শুনলাম। বক্তব্যে তিনি বলছেন, নির্বাচন হোক এরপর দেখবেন সবাই আপনাকে, আমাকে ভুলে যাবে। আমি যদি ভালো আচার-ব্যবহার করি তাহলে ভুলবে কেনো? অবশ্যই সাথে নিয়ে কাজ করবে। কিন্তু আমি যদি আগ্রাসী বক্তব্য অব্যাহত রাখি তাহলে কি আমাকে সাথে নিবে? অবশ্যই নিবেনা। আর যদি কেউ আন্দোলনের বিষয় টেনে আলাদা সুবিধা নিতে চায়, তবে দেশের কোটি কোটি মানুষ সেই সুবিধা নেওয়ার দাবিদার। কেননা সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণ ছিলো স্বৈরাচার পতনের আন্দোলনে। দল-মত নির্বিশেষে সকলের রক্তের বিনিময়ে নতুনভাবে পাওয়া বাংলাদেশ।
একটা বিষয় লক্ষ্য করলে দেখবেন, আওয়ামীলীগ যেমন কথায় কথায় জামায়াতের ওপর দোষ চাপাতো, তেমনি বর্তমানে একই ফর্মুলায় সবকিছু দোষ চাপছে বিএনপির ওপর। অথচ ছাত্র-জনতার আন্দোলনে বিএনপি ও দলটির অঙ্গসংগঠনের অন্তত ২০০ নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন। এরপরেও বিএনপির উদ্দেশ্যে কেউ কেউ বলে তারা নাকি ছাত্র জনতার আন্দোলনের সুফল হাইজ্যাক করে বর্তমান সময়ে সুবিধা নিচ্ছে।
বিভিন্নক্ষেত্রেই রুলিং পার্টির ছাত্র সংগঠনের মতো আচার-আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। যদি পার্টি ফর্মেশন করে, তাহলে ঘোষণা দিয়ে কাজ শুরু করা উচিত। রাষ্ট্রীয় প্রোটোকল, সার্কিট হাউজ ইত্যাদি ব্যবহার করে দল গঠনের কাজ করলে পরবর্তীতে সংগঠনটি বিতর্কিত হবে এবং সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় দলটি গঠিত হয়েছে বলে আখ্যায়িত হবে। যা সাময়িক সময়ের জন্য শক্তপোক্ত মনে হলেও, আগামীদিনে সংকটের সম্মুখীন হবে।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সমস্ত অর্জন যেমন আওয়ামীলীগ হাইজ্যাক করেছিলো, তেমনি ২৪’র গণআন্দোলনের সুফল যেনো কেউ এককভাবে হাইজ্যাক করতে না পারে সেটাই বাংলার প্রতিটি ছাত্র-জনতার প্রত্যাশা। আশা করি সবাই নমনীয় হয়ে একে অপরের কাঁধে কাঁধ রেখে অগ্রগামী বাংলাদেশ বিনির্মানে ভুমিকা রাখবে। আর নয় রাজনৈতিক বিরোধ, দেশের প্রশ্নে সবাইকে আপোষোহীন হতে হবে। 'বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের উচিত দ্রুততম সময়ের মধ্যে জেলা, উপজেলাগুলোতে বিদ্যমান আন্তকোন্দল বন্ধ করা। সেই সাথে যারা বিভিন্ন নামে অর্থ উত্তোলন সহ বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা নিতে এবং আওয়ামীলীগ, ছাত্রলীগকে পুর্নবাসনে ব্যতিব্যস্ত তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্তা গ্রহণ করা। নয়তো প্ল্যাটফর্মটির প্রতি সাধারণ মানুষের ক্ষোভের সৃষ্টি হবে।
শেখ রিফাদ মাহমুদ
উপদেষ্টা, গ্লোবাল স্টুডেন্ট ফোরাম
এডুকেশন রিলেশন অফিসার, কমনওয়েলথ স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন।







































