
# হত্যাকাণ্ডে জড়িত ছিলেন ৫-৬ জন
# ঢাকায় নারীসহ তিনজন গ্রেফতার
# খুনের পর মরদেহ টুকরো টুকরো করা হয়
ঝিনাইদহ-৪ আসনের সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজিম আনারের খুনের ঘটনায় বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পরিকল্পনাকারীর নাম, কীভাবে তাকে হত্যা করা হয়, হত্যায় কতজন অংশ নেয়, কেন তাকে কলকাতার ফ্ল্যাটে নেওয়া হয়েছিল, ঘনিষ্ঠ বন্ধুর সঙ্গে কী নিয়ে বিরোধ ছিল আস্তে আস্তে এসব তথ্য বেরিয়ে আসছে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এক নারীসহ সন্দেহভাজন তিনজন বাংলাদেশের পুলিশ হাতে গ্রেফতার হলে তাদের থেকে এসব তথ্য জানতে পারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ডিবি পুলিশের তথ্যমতে, নৃশংস এ হত্যার মূল পরিকল্পনাকারী এমপির বন্ধু ও ব্যবসায়িক পার্টনার আখতারুজ্জামান শাহিন। সে অনুযায়ী আগে থেকেই ভারতে অবস্থান করা কয়েকজন সন্ত্রাসীর সঙ্গে চুক্তি করেন তিনি।
গ্রেফতারকৃতরা ডিবিকে জানিয়েছে, হত্যার মিশনের জন্য বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে চার খুনিকে ভাড়া করা হয়েছিল। দুই খুনির পাসপোর্টসহ যাবতীয় খরচ বহন করেন মূল পরিকল্পনাকারী আখতারুজ্জামান শাহিন। তিনি আনোয়ারুল আজিম আনারের বাল্যবন্ধু। শাহিন ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুর এলাকায় বড় হলেও বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। এই হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ হয়ে প্রথমে ভারত, পরে নেপাল এরপর দুবাই হয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান তিনি। দেশ ছাড়ার আগে ২৭ লাখ টাকায় তার ব্যক্তিগত একটি অত্যাধুনিক গাড়ি বিক্রি করে দিয়ে যান। সেই গাড়িটি জব্দ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ।
ডিবি সূত্রে জানা যায়, শাহিন একজন ঠিকাদার। শত কোটি টাকার মালিক তিনি। তার এখনো বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ চলছে। রাজধানীর অভিজাত এলাকায় তার ফ্ল্যাট রয়েছে।
শাহিনের সঙ্গে আরও ছিলেন তার বেয়াই আমানুল্লাহ আমান। হত্যাকাণ্ডের ১৩ দিন আগে আমান ও শিলাস্তি রহমান শাহিনের কলকাতায় থাকা ফ্ল্যাটে ওঠেন। পরে শাহিন তাদের রেখে বাংলাদেশে ফেরত আসেন।
খুনিকে পাসপোর্ট বানিয়ে দেওয়া হয়
এমপি আনারকে হত্যায় বাংলাদেশ থেকে দুইজন খুনি অংশ নেন। তাদের মধ্যে একজনের নাম জিহাদ ওরফে জুয়েল আরেকজনের নাম সিয়াম। তারা ছয় থেকে সাত দিন আগে কলকাতায় যান। এরপর হত্যা মিশন শেষ করেন। ভারতে যাওয়ার পাসপোর্ট না থাকায় তাদের পাসপোর্ট করে দেন শাহীন ও তার বেয়াই আমান।
মিশন শেষে যুক্তরাষ্ট্রে পালিয়ে যান শাহীন
আখতারুজ্জামান শাহিন বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ নাগরিকত্ব পান। ফলে এই সুযোগ কাজে লাগান তিনি। কলকাতা থেকে ১০ মে ঢাকায় ফেরার পর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তিনি গা ঢাকা দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে যান যুক্তরাষ্ট্রে৷
গত ১৮ মে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর হয়ে প্রথমে ভারতে যান শাহিন। সেখান থেকে নেপাল ও দুবাই হয়ে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। বিদেশ পাড়ি দেওয়ার জন্য তিনি ভিস্তেরা এয়ারলাইন্স ব্যবহার করেন। যুক্তরাষ্ট্রে শাহিনের ঠিকানা পেয়েছে গোয়েন্দারা।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় শাহিনের একটি ফ্ল্যাট আছে। সেই ফ্ল্যাটের অভিযান চালিয়ে তার একটি ডায়েরি উদ্ধার করেছে গোয়েন্দারা। সেই ডায়েরিতে এই হত্যাকাণ্ডে কাকে কত টাকা দেওয়া হয়েছে এবং খরচ কত হয়েছে যাবতীয় বিষয় লিখে রাখা হয়েছে।
অন্যকে ফাঁসাতে সিম দিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি
আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের পর আমান ও আরেকজন হত্যাকারী আনারের মোবাইল দুটি নিয়ে দুই দিকে চলে যায় বলে তথ্য পেয়েছে ভারতীয় পুলিশ। তারা দেখতে পান আনারের দুটি সিমের লোকেশন দুই জায়গায় ছিল। হত্যাকারীরা তার পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে নাটক সাজায়। তার মোবাইল থেকে পরিবারের কাছে খুদে বার্তা পাঠানো হয়। এছাড়াও ঝিনাইদহ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদককেও কল করা হয়। কিন্তু ঘুমিয়ে থাকায় তিনি সেই কল ধরেননি বলে জানায় গোয়েন্দা পুলিশ।
আনারের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার থেকে বিভিন্ন ধরনের তথ্য দিয়ে ভারতীয় পুলিশ এবং বাংলাদেশি পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। গত ১৩ মে কলকাতায় আসার পর যে বাসায় তিনি উঠেছিলেন সেই বন্ধু গোপালের কাছেও মেসেজ পাঠানো হয়।
এখানেই শেষ নয়। খুনিরা নিজেদের বাঁচাতে অন্যের ওপর দায় চাপানোর চেষ্টাও করেন। কিন্তু সেই মিশনে তারা সফল হয়নি। তারা এমন কয়েকজনকে ফোন করেছিলেন যাদের সঙ্গে আনারের যোগাযোগ হতো না। এ কাজে তারা বেছে নিয়েছিলেন আনারের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে। ঝিনাইদহ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম মিন্টু ও ঝিনাইদহের সাবেক এক এমপিকেও অন্যদের মতো কল করা হয়েছিল। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করতে পারেননি। হত্যাকারীদের পরিকল্পনা ছিল কেউ তাদের ফোন ধরলেই বলবেন- ‘বস ফিনিশড।’
পাঁচ কোটি টাকায় চুক্তি, হত্যায় অংশ নেয় পাঁচজন
শাহিনের সহযোগী তার বেয়াই আমানুল্লাহ আমানকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ গ্রেফতার করলে তিনি নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য দেন। আমান ডিবিকে জানিয়েছে, হত্যার জন্য পাঁচ কোটি টাকা চুক্তি হয়েছিল। তার মধ্যে কিছু টাকা খুনিদের ঢাকায় দেওয়া হয়। বাকি টাকা শাহিন ১৩ মে কলকাতায় গিয়ে দেবেন বলেও কথা ছিল। আমানও জানতেন শাহিন আবার কলকাতা যাবেন। কিন্তু তিনি দেশে ফিরে যুক্তরাষ্ট্রে পাড়ি জমান।
হত্যার সময় ছিলেন আমান, জিহাদ, সিয়াম, ফয়সাল ও মোস্তাক। হত্যার কাজে একটি চাপাতি কেনা হয়েছিল, যেটি আগেই রাখা ছিল শাহিনের ফ্ল্যাটে। মূলত আনারকে নারী ট্র্যাপে ফেলে নেওয়া হয় শাহিনের ফ্ল্যাটে। সেখানে নিয়ে শাহিনের পাওনা টাকা দিতে বলেন। এ নিয়ে শুরু হয় তাদের তর্ক। পরে তাকে বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করেন।
হত্যার পর মরদেহ ভরা হয় লাগেজে
আনারকে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে হত্যাকারীরা দুটি লাগেজ কিনে নেয়। পরে একটি গাড়িতে করে মরদেহ ফেলে দেওয়া হয়। সেই গাড়িচালককে গ্রেফতার করেছে কলকাতা পুলিশ। তিনি এসব তথ্য দেন ওই দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে। মরদেহ লাগেজে ভরার আগে টুকরো টুকরো করা হয়।
হত্যার নেপথ্যে
আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধারণা হুন্ডি ব্যবসা ও স্বর্ণ চোরাচালানের টাকার দ্বন্দ্বে আনার খুন হয়ে থাকতে পারেন। আনারের সঙ্গে শাহিন একই ব্যবসা করেন। হুণ্ডি ও স্বর্ণ চোরাচালানের বিরোধ ছিল তাদের মধ্যে। আনারের কাছে শাহিন টাকা পেতেন। এ নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে হত্যা করা হতে পারে। হত্যার পরিকল্পনা হয় দেড় মাস আগে। হত্যাকাণ্ডে আর কারা জড়িত তা নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করছে পুলিশ।
কে এই আমান?
আমানুল্লাহ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক নেতা। একসময় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির বড় নেতা ছিলেন। ঝিনাইদহে ১৯৯১ সালে যশোরের অভয়নগরের গণেশ নামে এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত কারাগারে ছিলেন। এরপর ২০০০ সালে ইমান নামে আরেকজনকে হত্যায় দায়ে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কারাবন্দি ছিলেন। আমানের গ্রামের বাড়ি খুলনার ফুলতলার দামোদরে।
গোয়েন্দা পুলিশ প্রধানের ভাষ্য
ঢাকা মহানগর পুলিশের প্রধান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ বলেছেন, এই হত্যাকাণ্ড নিয়ে নানা ভুল তথ্য ছাড়ানো হচ্ছে। তবে কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড তা তারা তদন্ত করছেন। দুই দেশের পুলিশ এ বিষয়ে কাজ করছে।







































