
জিম্মির ছয় দিন পেরিয়ে গেলেও জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহর মালিকপক্ষের সঙ্গে জলদস্যুরা যোগাযোগ করেনি। মালিকপক্ষও জলদস্যুদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি। এতে জাহাজটির ২৩ নাবিকের পরিবারে উৎকণ্ঠা বেড়েছে। সেই উৎকণ্ঠায় নতুন করে ঘি ঢেলেছে ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি অভিযানের তথ্য। ভারতের নৌবাহিনী এক্স (সাবেক টুইটার) বার্তায় জানিয়েছে, তারা জলদস্যুদের কবল থেকে মাল্টার পতাকাবাহী এমভি রুয়েন নামক বাল্ক ক্যারিয়ার উদ্ধার করেছে। অভিযানের সময় জাহাজে থাকা ৩৫ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করেছে; উদ্ধার হয়েছেন ১৭ নাবিক।
এমন তথ্য প্রচারের পর বাংলাদেশি পতাকাবাহী এমভি আব্দুল্লাহর ২৩ নাবিক পরিবারে উৎকণ্ঠা বেড়েছে। এসব পরিবারের সদস্যরা ভাবছেন, ভারতীয় নৌবাহিনী যদি এমভি আবদুল্লাহ উদ্ধার করতে অভিযান শুরু করে এবং যদি গোলাগুলির ঘটনা ঘটে, তাহলে নাবিকদের বিপদ হতে পারে। ভারতীয় বাহিনী যদি অভিযান শুরু না-ও করে, জলদস্যুরা যদি প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে এমভি আব্দুল্লাহর নাবিকদের ওপর চড়াও হতে পারে।
বৃহস্পতিবার থেকে বাংলাদেশে ভারতীয় নৌবাহিনীর দুটি খবর প্রচার পায় বাংলাদেশে। প্রথম খবরটি এরই মধ্যে গুজব হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। দ্বিতীয় খবরটি দেয় ভারতীয় নৌবাহিনী। তারা এক্স বার্তায় জানায়, ‘বিশেষ কমান্ডো অভিযান চালিয়ে সোমালিয়ান জলদস্যুদের কবল থেকে মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ উদ্ধার করা হয়েছে। এ সময় ১৭ নাবিককে উদ্ধার করা হয় এবং ৩৫ জলদস্যু আত্মসমর্পণ করে।’ এ খবর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়।
খবর এসেছে, ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি যুদ্ধজাহাজ এরই মধ্যে এমভি আবদুল্লাহকে অনুসরণ করেছে এবং ছবি তুলেছে।এ বিষয়টিকে ভালোভাবে নেয়নি এমভি আব্দুল্লাহর জলদস্যুরা। জিম্মি নাবিকদের একজনের স্বজনের মাধ্যমে জানা গেছে, জলদস্যুরা জিম্মিদের কাছে জানতে চেয়েছে, জাহাজের ভেতরের খবর বাংলাদেশের গণমাধ্যমে কীভাবে প্রচার পাচ্ছে। ওই নাবিক জাহাজের অভ্যন্তরীণ খবর খুব বেশি প্রচার না করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
এমভি আব্দুল্লাহর সেকেন্ড ইঞ্জিনিয়ার মো. তৌফিকুল ইসলামের স্ত্রীর ভাই শিবলি মাহমুদ বলেন, ‘আমরা শুনেছি ভারতীয় নৌবাহিনী এমভি আব্দুল্লাহ উদ্ধারে অভিযান শুরু করেছে। এতে আমাদের দুশ্চিন্তা আরও বেড়েছে। কারণ ভারতীয় নৌবাহিনীর অভিযানের কারণে যদি জলদস্যুরা ক্ষিপ্ত হয়! তখন তারা আমাদের লোকজনদের ওপর চড়াও হতে পারে। তাই এখন আমাদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে আরও বেশি দুশ্চিন্তা কাজ করছে।’
তবে এমভি আব্দুল্লাহ উদ্ধারে ভারতীয় নৌবাহিনী অভিযানে গেছে বা যাবে এমন কোনো খবর পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমে প্রচারিত কিছু খবরের কারণে এমন শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এরপর ভারতীয় নৌবাহিনীর মাল্টার পতাকাবাহী জাহাজ উদ্ধারের খবরে উৎকণ্ঠা ছড়ায়।
জিম্মি একাধিক নাবিকের পরিবার এমন আশঙ্কা করলেও কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন এমভি আবদুল্লাহর প্রধান কর্মকর্তা আতিকুল্লাহ খানের ছোট ভাই আব্দুল্লাহ খান আসিফ। তিনি বলেন, ‘এমভি আবদুল্লাহ এখন সোমালিয়ার উপকূলে। আমার ধারণা, সোমালিয়ার উপকূল পর্যন্ত যাবে না ভারতীয় নৌবাহিনীর জাহাজ। এ ছাড়া গত বৃহস্পতিবার যখন স্যাটেলাইট ফোন থেকে আমার ভাই কথা বলেন তখন জানিয়েছিলেন, এমভি আবদুল্লাহ থেকে ভারতীয় জাহাজটি আর দেখা যাচ্ছে না। এরপর জলদস্যুরা জাহাজটি নোঙর তুলে আরও দূরবর্তী স্থানে নিয়ে নতুনভাবে নোঙর করেছে। তাই আমার ধারণা, বাংলাদেশি নাবিকদের পরিবারের এখন আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার কিছু নেই।’
এমভি আবদুল্লাহর সঙ্গে সর্বশেষ কখন যোগাযোগ হয়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে জাহাজটির মূল প্রতিষ্ঠান কেএসআরএমের (কবির গ্রুপ) মিডিয়া উপদেষ্টা মিজানুল ইসলাম বলেন, ‘শুক্রবার রাত ৮টায় সর্বশেষ যোগাযোগ হয়। ওই সময় পর্যন্ত জাহাজটি আগের স্থানে নোঙর করা ছিল। শনিবার নতুন করে স্থানান্তর করেছে কি না তা দুপুর পর্যন্ত নিশ্চিত হতে পারিনি।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘জলদস্যুদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত যোগাযোগ করা হয়নি। আমাদের জাহাজ কোম্পানি এসআর শিপিং লাইন্স সরকারের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রেখে কাজ করছে। জিম্মি নাবিকদের উদ্ধার করতে জলদস্যুদের এজেন্টদের সঙ্গে যোগাযোগের অপেক্ষায় আছি আমরা।’
চট্টগ্রামভিত্তিক শিল্পগ্রুপ কেএসআরএমের জাহাজ কোম্পানি এসআর শিপিং লাইন্সের জাহাজ এমভি আব্দুল্লাহ। এর আগে ২০১০ সালের ডিসেম্বর একই কোম্পানির জাহাজ জাহান মনি অপহরণ করে সোমালিয়ার জলদস্যুরা। কোম্পানিটি প্রায় ১০০ দিন চেষ্টা চালিয়ে জাহাজ ও নাবিকদের উদ্ধার করতে সক্ষম হয় সে সময়।
এসআর শিপিংয়ের প্রধান নির্বাহী ক্যাপ্টেন মেহেরুল করিম অভিজ্ঞ ব্যক্তি। তিনি জাহান মনি ছিনতাইয়ের পর সার্বক্ষণিকভাবে উদ্ধার তৎপরতায় জড়িত ছিলেন। জিম্মি জাহাজ উদ্ধারে তাকে বলা হয় অভিজ্ঞ লোক। কারণ বাংলাদেশি অন্য কোনো কোম্পানির জাহাজ অতীতে জিম্মি হয়নি। এরই মধ্যে মেহেরুল করিম সম্ভাব্য সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বলে জানা গেছে। কিন্তু জলদস্যুদের পক্ষ থেকে সাড়া না পাওয়ায় আনুষ্ঠানিক আলাপ শুরু হয়নি।







































