
যাত্রাবাড়ীর ধলপুরের বাদল সরদার গলি। মাঝ বয়সি গৃহকর্মী অঞ্জিমালা ছুটা বুয়ার কাজ করেন বিভিন্ন বাসা-বাড়িতে। মূলত মাসিক ১ হাজার টাকার বিনিময়ে কাপড় ধোয়া বা ঘর মোছার কাজ তার। তবে গত ৪-৫ মাস ধরে পানিতে খুবই দুর্গন্ধ ও ময়লা থাকায় ঠিকমতো কাপড় ধুতে পারেন না। পুরো এলাকার মানুষ ওয়াসার পানি ব্যবহার করলেও দুর্গন্ধ এতই মারাত্মক যে, নাকের কাছেই নেওয়া দায়। পানি থেকে সুয়ারেজের ময়লা এমনকি মল-মূত্রের দুর্গন্ধও আসে।
এর ফলে অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, স্থানীয় বাসিন্দারা এ পানি কোনো কাজেই ব্যবহার করতে পারেন না। না পারেন গোসল করতে, না পারেন কাপড় ধুতে। কোনো কাজেই ব্যবহার করতে পারেন না এ পানি। এ বিষয়ে ওয়াসার স্থানীয় অফিসসংশ্লিষ্ট কর্মীদের কাছে অভিযোগ জানিয়েও মেলে না কোনো প্রতিকার। অন্যদিকে মাসের পর মাস এমন দুর্গন্ধযুক্ত ময়লা পানিই অনেকে ব্যবহার করেন বাধ্য হয়ে। এতে শিশু থেকে বৃদ্ধ সব বয়সি বাসিন্দার পেটের নানা সমস্যাসহ চর্ম রোগ দেখা দিচ্ছে।
শুধু যাত্রাবাড়ীর ধলপুর নয়, এমন চিত্র ঢাকার অনেক এলাকারই। রমজানের আগে অনেক এলাকায় সমস্যা সহনীয় পর্যায়ে থাকলেও রমজান শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পানির অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছে যে, এখন তা যেমন পান করা যাচ্ছে না, তেমনই রান্না বা কাপড় ধোয়ার কাজেও ব্যবহার করা যায় না। বিশুদ্ধ পানির অভাবে রান্না, নামাজ, রোজা, ইফতারি ও সেহরি ঠিকমতো করতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোর বাসিন্দারা।
এলাকাবাসীর অভিযোগ, রাজধানীর লালবাগ, মধুবাগ, গুলবাগ, মালিবাগ, খিলগাঁও, স্বামীবাগ, যাত্রাবাড়ী এবং লালবাগ এলাকায় কয়েক দিন ধরে পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বাধ্য হয়ে এলাকাবাসীকে মসজিদ থেকে বা ওয়াসার গাড়ির পানি কিনে বা অন্য উপায়ে পানি সংগ্রহ করতে হয়। বছরের অন্য সময়ের চেয়ে রমজানের সময় মানুষ একটু বেশি স্বাচ্ছন্দ্য চায়। কেননা রমজান মাসটি মুসলিমদের কাছে শুধু এবাদত করার মাস। পানি সংগ্রহ করতে গিয়ে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ায় ইবাদতে ব্যাঘাত ঘটে। তা ছাড়া রোজা রেখে বাড়তি পরিশ্রম করাও অনেক কষ্ট।
বাদল সরদার গলির শেষ মাথার একটি বাড়ির মালিক আবদুল্লাহ আল হাসান বলেন, ৬ মাসেরও বেশি সময় ধরে ওয়াসার পানি একদম ব্যবহার করা যায় না বললেই চলে। পাশের একটি জায়গা থেকে পানি কিনে ব্যবহার করতে হয়। ওয়াসার পানিতে এতই দুর্গন্ধ যে, ফোটানোর পরও বিন্দুমাত্র কমে না।
এই বাড়িওয়ালা বলেন, আগে ওয়াসার লাইনের পানি ফুটিয়ে খাওয়া ও রান্নার কাজে ব্যবহার করা যেত। কখনো কখনো ফোটানো ছাড়াও রান্নার কাজে ব্যবহার করা হতো। কিন্তু এখন অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, এই পানি নাকের কাছেই নেওয়া যায় না। খাওয়া বা রান্নার কাজে ব্যবহার তো দূরের কথা-এই পানি দিয়ে গোসলও করতে পারে না এলাকার বাসিন্দারা।
কিছু দিন পর পর খোঁড়াখুঁড়ির কারণে পানির পাইপ ফুটো হয়ে সেখানে স্যুয়ারেজের পানি ঢুকছে বলে ধারণা করছেন তারা। গুলবাগের হানিফ শিকদার বলেন, পানির অভাবে সারা দিন গোসল করতে পারিনি। রান্না করার জন্য পানি অন্য জায়গা থেকে সংগ্রহ করতে হয়েছে। মসজিদ থেকে পানি নিয়ে এসেছি।
স্বামীবাগের জাকির বলেন, এলাকায় দুদিন ধরে পানি নেই। মালিবাগের ইউরেকা এপার্টমেন্টের বাসিন্দারা পানি না পেয়ে বাধ্য হয়ে ওয়াসার গাড়ির পানি কিনে নিয়ে আসেন। শনিবার সকালে ও রাতে দুবার ওয়াসার পানির গাড়ি থেকে পানি সংগ্রহ করা হয়।
মধ্য বাড্ডার আল আমিন জানান, পানি না থাকায় বাধ্য হয়ে তিনি আত্মীয়ের বাসায় অবস্থান করছেন।
ঢাকা ওয়াসা বলছে, তাদের পানি সরবরাহ কমে গেছে। এ জন্য কিছু কিছু এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া চলমান উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে সিটি করপোরেশন কিছু কিছু জায়গায় ওয়াসার পানির পাইপ ভেঙে বা ছিদ্র করে দিয়েছে। সেসব ছিদ্র দিয়ে পানির সঙ্গে ময়লা মিশে পানি দুষিত করছে। এ ছাড়া লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় মেরামতের জন্য কিছু কিছু এলাকায় পানি সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে।
লালবাগের বাসিন্দা ২৩ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মকবুল হোসেন বলেন, গত ৩-৪ দিন ধরে এলাকায় তীব্র পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন রোজাদার এলাকাবাসী। ওয়ার্ডের মধ্যে আবদুল আজিজ লেন, ললিত মোহন দাস লেন, নবাবগঞ্জ রোড, হোসেন উদ্দিন খান প্রথম লেন, দ্বিতীয় লেন, সুবল দাস রোডসহ বেশ কিছু এলাকায় পানির সংকট দেখা দিয়েছে। এ বিষয়ে ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। গতকাল তাদের লোকজন এসে জানিয়েছে, পানি সরবরাহ কম রয়েছে। কয়েক দিনের মধ্যে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু শনিবারও পানি সরবরাহ ঠিক হয়নি। পানি সংকট নিয়ে এলাকাবাসীর ফোনে অতিষ্ঠ বলে জানান তিনি।
মুগদা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগের চিকিৎসক ডা. আবুল হাসেম বলেন, গত কয়েক মাস ধরে যাত্রাবাড়ীসহ আশপাশের এলাকায় চর্মরোগীর সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। তাদের অনেকেই পানিতে সমস্যার কথা বলেছেন। রমজান শুরুর আগে কয়েক দিন মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চর্মরোগ বিভাগে সরেজমিন চর্মরোগীর উপস্থিতি দেখা গেছে অনেক। সিরিয়াল এত লম্বা থাকে যে, বহির্বিভাগে ৪-৫ জন চিকিৎসক সকাল থেকে রোগী দেখেও শেষ করতে পারেন না। দুপুরের পরও রোগীদের সিরিয়াল অনেক লম্বা থেকে যায়।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খানকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। ওয়াসা হেল্পলাইন ১৬১৬২ নম্বরে ফোন করা হলে সেখানে কর্তব্যরত নাইম বলেন, কোনো কোনো এলাকায় পানি সরবরাহে সমস্যা হচ্ছে। কারণ এখন পানি সরবরাহ কিছুটা কম। এ ছাড়া উন্নয়নকাজ করতে গিয়ে বিভিন্নস্থানে ওয়াসার পানির পাইপ সিটি করপোরেশন ফাটিয়ে ফেলেছে। এ জন্য সেখান দিয়ে ময়লা মিশে পানি দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে পড়ছে। এগুলো ঠিক করার জন্য কিছু এলাকার লাইন অফ রাখা হচ্ছে। শিগগিরই সমস্যা সমাধানে কাজ করছে ওয়াসা।







































