
চৈত্র মাসের কাঠফাটা রোদ আর দাবদাহে হাঁসফাঁস অবস্থা জনজীবন। দুর্বিসহ গরমে ঘরে-বাইরে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। গত কয়েকদিনের কড়া রোদের সঙ্গে ভ্যাপসা গরমে ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত নানা রোগে আক্রান্তদের চাপ বাড়ছে হাসপাতালগুলোতে। এছাড়াও জন্ডিস, হিট স্ট্রোক, সর্দি-জ্বর নিয়েও হাসপাতালে ছুটে আসছেন রোগীরা। তবে বেশি অসুস্থ হচ্ছেন বয়স্ক ও শিশুরা। এর মধ্যে রাজধানীর মহাখালির আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর’বি) বা কলেরা হাসপাতাল প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫’শ রোগী ভর্তি হচ্ছেন। গত এক সপ্তাহে তিন হাজারের বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন। আর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটেও রোগী সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
বুধবার সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালগুলোতে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় চার থেকে পাঁচগুণ বেশি রোগী ভিড় জমাচ্ছে। সকাল থেকে রোগীর সংখ্যা চাপ কম হলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে। তাদের সামলাতে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা।
চিকিৎসকরা বলছেন, গরমে অতিরিক্ত ঘাম কারণে শরীরে পানিশূন্যতা তৈরি হচ্ছে। আবার বাতাসের আদ্রতা স্বাভাবিকের চেয়ে কম হওয়ায় তাপাদাহের মধ্যে ঠোট শুকিয়ে ও ফেটে যাচ্ছে। আবার গ্রামের মানুষ স্বাস্থ্যসচেতন নয়। অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে থাকার কারণে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপও বাড়ছে। তাই গরমে বেশি বেশি বিশুদ্ধ পানি পান করা, ফলমূলের সরবত পান, পচা-বাসী ও বাইরের খাবার না খাওয়া এবং জরুরি প্রয়োজন ছাড়া ঘরের বাইরে যাওয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
কলেরা হাসপাতালে একাধিক রোগী স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েকদিন ধরে তীব্র তাপদাহে শুধু রাজধানী নয়, সারাদেশ থেকেই ডায়রিয়ার রোগী আসছে কলেরা হাসপাতালে। রোগীরা ডায়রিয়া শুরুর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং হাঁটাচলার শক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলছে। কেউ সরাসরি এইখানে নিয়ে এসেছেন আবার অনেকে অন্য হাসপাতাল থেকে রেফারে এখানে নিয়ে এসেছেন। হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্সরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। যদিও এখন পর্যন্ত ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়ে কারো মৃত্যু হয়নি।
আইসিডিডিআরবির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত ২৮ মার্চ ৫০৭ জন ডায়রিয়া আক্রান্ত রোগী ভর্তি হয়। এরপর ২৯ মার্চ ৫০১ জন, ৩০ মার্চ ৫৪৫ জন, ৩১ মার্চ ৪৪৮ জন, ১ এপ্রিল ৫০৫ জন, ২ এপ্রিল ৪৯৮ জন এবং ৩ এপ্রিল বুধবার বেলা ১১টা পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন ২০৫ জন। অর্থাৎ গত সাত দিনে মোট রোগীর ভর্তির সংখ্যা ৩ হাজার ২০৯ জন।
নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলা এলাকা থেকে এসেছেন রেনু বেগম। তার ১৭ মাসের শিশু শিশু আইমানকে কোলে নিয়ে কান্নাকাটি করছে। চোখে মুখে দু:চিন্তা আর হতাশার প্রকাশ করে তিনির বলেন, সবার রোগী ভালো হয়ে যায়। কিন্তু আমার বাচ্চাটা ভালো হচ্ছে না। বমি আর ডায়রিয়া বন্ধ হয় না। শুধু কান্নাকাটি করে। বুকের দুধ পর্যন্ত খাচ্ছেন না। শরীর ক্রমেই দূর্বর হয়ে পড়ছে। ছেলের চিন্তায় তাদের পুরো পরিবার খুবই দু:চিন্তায় আছে বলেও জানান তিনি।
কেরানীগঞ্জ থেকে দুই বছরের ছেলেকে নিয়ে আসা এসেছেন আলি হোসেন। তিনি জানান, গরমের কারণে দুই দিন ধরে ডায়রিয়া হচ্ছে। প্রথমে ফামের্সী থেকে ওষুধ খাওয়ার পরও ভাল হয়নি। পরে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে ওখানকার চিকিৎসকরা কলেরা হাসাপাতালে রেফার্ড করেছে। গতরাত এখানে ভর্তি করেছি। তার পর থেকে কিছুটা উন্নতি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাসানটেক এলাকা থেকে আরেক রোগী জামাল হোসেন (৬০) বলেন, মঙ্গলবার রাতে ভর্তি হয়েছি। আমার এলাকার পানিতে প্রচুর ময়লা ও র্দুগন্ধ আসে। আমরা মনে হয় সেই পানি খাওয়ার কারণেই ডায়রিয়া হয়েছে। তার ছেলে পাপ্পু মিয়াও একই কথা বলেন।
গরমের কারণে হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর চাপ কতটা বেড়েছে এমন প্রশ্নের জবাবে আইসিডিডিআর,বির এসিটেন্ট সায়েন্টিস্ট শোয়েব বিন ইসলাম আলোকে বলেন, গত কয়েকদিনের অসহনীয় গরমে রোগীর স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেড়েছে। স্বাভাবিক সময়ে এখানে গড়ে ২৫০/৩০০ রোগী ভর্তি হয়ে থাকে। কিন্তু এখন রোগীর ভর্তির গড় ৫’শ ছাড়িয়েছে। যদিও কিছুদিন আগে রোগীর চাপ আরও বেশি ছিল। তবে এখন যে তাপমাত্রা বিরাজ করছে তা যদি অব্যাহত থাকে তাহলে হাসপাতালে ডায়রিয়া রোগীর চাপ আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, আমরা যে সব রোগী পাচ্ছি তার বেশির ভাগই হচ্ছে পানিরাহিত ডায়রিয়া রোগী। গরমের কারণে সবাই পিপাসার্ত থাকেন। বিশেষ করে দরিদ্র শ্রেণীর মানুষ যারা বেশিরভাগ সময়ে বাইরে থাকেন। তাই তৃষ্ণা মেটাতে অনেকেই অনিরাপদ পানি পান ও অস্বাস্থ্যকর খাবার খেয়ে থাকেন। এতে ফুড পয়জনিং থেকে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া টাইফয়েড ও পানিবাহিত হেপাটাইটিস, জন্ডিস হওয়ার সম্ভবনাও থাকে। বিশেষ করে শিশুদের ডায়রিয়া হলে অনেক ক্ষেত্রেই বিষয়টা অভিভাবকরা গুরুত্বের সঙ্গে নেন না। কিন্তু ডায়রিয়ার চিকিৎসা খুবই সহজ। নিকটস্থ হাসপাতাল থেকে শুরু করে সব জায়গায় ডায়রিয়ার ভাল চিকিৎসা ব্যবস্থা রয়েছে। আর যতবার পাতলা পায়খানা হবে, ততবার একটি করে খাবার স্যালাইন খেতে হবে। এভাবে চলতে থাকলে এমনিতেই রোগী সুস্থ হয়ে যাবে, তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসারও প্রয়োজন হবে না।
রাজধানীর শিশু হাসপাতালে সরেজমিনে দেখা গেছে, বহি:র্বিভাগ থেকে শুরু জরুরী বিভাগ, মেডিসিন বিভাগ এবং শিশু বিভাগে সামনে রোগী ও স্বজনদের জটলা। চিকিৎসকদের রুমের সামনেও দীর্ঘ লাইন। সময় বাড়ার সাথে সাথে রোগীর চাপ সামাল দিতে বেসামাল অবস্থা দেখা যায়। বেশিরভাগ রোগীকে প্রেসক্রিপশন দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। ফাঁকা নেই কোন শয্যা, বরং শয্যার বাইরেও অতিরিক্ত রোগী ভর্তি আছে।
বাচ্চাদের স্বজনদের কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দিনের অহসহনীয় গরমে জ্বর, কাশি, গায়ে ব্যথা, শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা নিয়ে এসেছেন সবাই। অনেকে এসেছেন পেটের পীড়া ও ডায়েরিয়া নিয়ে। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে নবজাতক ও শিশুরা।
হাসপাতালের বহি:র্বিভাগে কথা হয় মিরপুর ১২ থেকে আসা শারমিন আক্তারের সঙ্গে। তিনি তার ৪৫ দিনের বাচ্চাকে নিয়ে এসেছেন। তিনি জানান, বাচ্চার পাতলা পায়খানা ও বমি হচ্ছে। শরীরে বিভিন্ন ধরনের লাল লাল দানার মতো ফুসকা উঠেছে। চিকিৎসকরা বলেছেন গরমের কারণে এমনটা হয়েছে। এখন ওষুধপত্র লিখে দিয়েছেন। যদি তিন দিনের মধ্যে ভাল না হয় তাহলে আবার আসতে বলেছেন। হাসপাতালে ভর্তি রিভান সরকারের মা মুক্তা বেগম বলেন, যে গরম পড়ছে। আমরা বড় মানুষও টিকতে পারছি না। অসুস্থ হয়ে পড়ছি। আমার বাচ্চার জন্ডিস হওয়ায় গতকাল রাতে এখানে ভর্তি হয়েছি।
হাসপাতালের বহি:র্বিভাগের চিকিৎসক রেজওয়ান সরওয়ার বলেন, গরমের কারণে ডায়রিয়া ও জ্বরসহ বিভিন্ন ধরনের রোগীর চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে খুব বেশি নয়। তবে সামনের দিনগুলোতে রোগীর চাপ বাড়তে পারে।
গরমের এই সময়ে শিশুদের প্রতি অভিভাবকদের আরও যত্নশীল থাকার পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হলে প্রাপ্ত বয়স্ক রোগীদের তুলনায় শিশুরা বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পাতলা পায়খানা ও বমি শুরু হলে শিশুকে মুখে খাবার স্যালাইন বার বার খাওয়ানো ও মায়ের বুকের দুধও খাওয়াতে হবে। প্রয়োজনে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
শিশু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, গত তিনদিনে ডায়রিয়ায় আক্রান্ত প্রায় ৫০ জন শিশু হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এই সময়ে বহি:র্বিভাগ ও জরুরী বিভাগ থেকে চিকিৎসা নিয়েছেন প্রায় ২০০ জন রোগী। এর মধ্যে গত ২৪ ঘন্টায় হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সেবা নিয়েছেন ৭৫ জন রোগী। তাদের মধ্যে ভর্তি হয়েছেন ১৫ জন।
ঢাকা শিশু হাসপাতালে পরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ঋতু বা আবহাওয়া পরিবর্তন, এবং ভ্যাপসা গরমসহ নানা কারণে ডায়রিয়াসহ ঠান্ডা-জ্বর, নিউমোনিয়া এবং বিভিন্ন ধরনের রোগ হচ্ছে। এছাড়া পরিবেশ কারণে ভাইরাল দূষণ অনেক বেড়ে গেছে। অনেক বেশি মৌসুমি ফ্লু পাচ্ছি। তাই গরমকালে শিশুদের ক্ষেত্রে সবধানতা খুব বেশি প্রয়োজন। কারণ এদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় অল্পতেই অসুস্থ হয়ে পরতে পারে। প্রয়োজন ছাড়া বাইরে বের না হওয়াই ভাল। আর কোনভাবেই ধুলাবালিযুক্ত জায়গায় যাওয়া যাবে না। বাচ্চাদের কাপড় গুলো যেনো আরামদায়ক হয় সেদিকে অভিভাবকদের খেয়াল রাখতে হবে। একই সঙ্গে গরমে যেনো শিশু ঘেমে না যায়। সেদিকে নজর দিতে হবে।
গরমের এই সময়ে তরলজাত ও পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরার্মশ দিয়ে তিনি বলেন, রাস্তার পাশে অস্বাস্থকর ও উম্মত এবং পঁচাবাসী খাবার খাওয়া যাবে না। পায়খানা বা টয়লেট ব্যবহার করার পর অবশ্যই ভালভাবে সাবার দিয়ে হাত ধৈৗত করে নিতে হবে। এছাড়া বিশুদ্ধ ও ফুটানো পানি পান করতে হবে।







































