
অগ্রিম টিকিটে ঈদযাত্রার দ্বিতীয় দিন আজ। সকাল থেকে বিলম্ব ছাড়াই চলছে ট্রেন। ঈদের ছুটি এখনো শুরু না হওয়ায় কমলাপুর স্টেশনে বাড়েনি যাত্রীর চাপ। গত ২৫ মার্চ যেসব যাত্রী অগ্রিম টিকিট পেয়েছেন, কেবল তারাই আজ কমলাপুর থেকে যাচ্ছেন দেশের বিভিন্ন স্থানে। ঈদের এখনো সপ্তাহখানেক বাকি, শুরু হয়নি এ উৎসবকেন্দ্রিক ছুটিও। তবে ঈদযাত্রায় পদে পদে ভোগান্তি এবং সড়ক-মহাসড়কে দীর্ঘ যানজটের দুর্ভোগ এড়াতে আগেভাগেই শেকড়ের টানে ঘরমুখো হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যেসব মানুষের কর্মস্থল থেকে ছুটি নেওয়ার ঝক্কি-ঝামেলা নেই, তারা এখুনি গ্রামের পথে পা বাড়িয়েছেন। ফলে বাস-লঞ্চ-ট্রেনে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে ঈদের ছুটি শুরুর আগেই যাত্রাপথে ভোগান্তি বাড়বে- এমন আশঙ্কা অনেকের।
পরিবহণ সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর (সওজ) মহাসড়কের ১৫৫ স্থানকে ঈদযাত্রায় যানজটপ্রবণ হিসেবে চিহ্নিত করলেও বাস্তবে এ সংখ্যা ৭শ’ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এ ছাড়া রাজধানী ঢাকা থেকে বেরোনোর পথে গণপরিবহণের যাত্রীরা যানজটের চরম ভোগান্তিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। মহাসড়কের অবস্থা ভালো হলেও একসঙ্গে ঘরমুখো মানুষের চাপে বাড়তে পারে ছোট-বড় দুর্ঘটনাও।
এদিকে যাত্রীকল্যাণ সমিতির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে ১ কোটি, গাজীপুর থেকে ৪০ লাখ, নারায়ণগঞ্জ থেকে ১২ লাখসহ মোট ১ কোটি ৬০ লাখ যাত্রী দেশের বিভিন্ন জেলায় যাতায়াত করতে পারেন। গণপরিবহণে সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করা না গেলে এবারের ঈদযাত্রায় হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গণপরিবহণে ঘরমুখো মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব আশঙ্কা মাথায় রেখে আগেভাগেই গন্তব্যে ছুটছেন তারা। কর্মজীবীরা নিজে যেতে না পারলেও পরিবারের অন্য সদস্যদের আগেই বাড়ি পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কেউ কেউ শবেকদরের আগের তিন-চারদিনের অতিরিক্ত ছুটি নিয়ে পরিবারের সঙ্গে আগাম ঈদযাত্রায় শামিল হয়েছেন।
ঢাকা থেকে সন্তানদের নিয়ে খুলনার পথে রওনা দিয়েছেন গৃহবধূ নুসরাত শামীমা। সোহাগ পরিবহণ বাসের এই যাত্রী বলেন, ‘ঈদের ছুটির সময় যাত্রীদের চাপ বেশি থাকে। যানজটে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হয়। তাই সন্তানদের নিয়ে আগেই বাড়ি যাচ্ছি।’ ঈদের ছুটি শুরু হওয়ার পর তার চিকিৎসক স্বামী ও চাকরিজীবী ছোটভাই বাড়ি ফিরবেন বলে জানান তিনি।
যশোরগামী হানিফ পরিবহণের যাত্রী আব্দুস সাত্তার জানান, তিনি ঢাকা থেকে ছেলের বউ আর নাতিদের নিয়ে মনিরামপুরে গ্রামের বাড়ি যাচ্ছেন। রেডিমেড গার্মেন্টস ব্যবসায়ী ছেলে ঈদের আগের দিন রাতে গ্রামে রওনা দেবে।
বেনাপোলগামী যাত্রী সোহানা পারভীন জানান, তিনি স্বামীর সঙ্গে মালিবাগে থাকেন। তার স্বামীর বনানীতে ছোট একটি বুটিক শপ রয়েছে। ঈদের আগে এ ক’দিন ক্রেতার ভিড় থাকবে। তাই ঈদযাত্রার ভোগান্তি এড়াতে তিনি দুই সন্তান ও শাশুড়িকে নিয়ে বাড়িমুখো হয়েছেন। ঈদের আগের দিন নাইটকোচে তার স্বামী গ্রামে ফিরবেন।
ঢাকার বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকা মেহজাবিন সুলতানা জানান, খুলনার দাকোপে গ্রামের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা-মা আর ছোট দুই ভাই আছে। স্কুল ছুটি হয়ে যাওয়ায় তিনি আগেভাগেই বাড়ি ফিরছেন। যানজটের আশঙ্কায় ভোরের গাড়ির টিকিট কেটেছেন। কিন্তু শহর থেকে গাড়ি বের হতেই প্রায় দেড় ঘণ্টা কেটে গেছে। বাকি পথে কতটা ভোগান্তি পোহাতে হবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা রাজীব আহমেদ ঢাকায় চাকরির প্রস্তুতির পাশাপাশি ফ্রিল্যান্সিং করেন। ঈদযাত্রায় গণপরিবহণের ভোগান্তি এড়াতে আগেভাগেই ঢাকা ছাড়ছেন তিনি।
রাজীবের ভাষ্য, ৯ এপ্রিল অফিস খোলা থাকলেও ৪ এপ্রিল থেকেই বাস, ট্রেন, লঞ্চে চাপ বাড়বে। এ সময় পথে পথে যানজটসহ নানা ভোগান্তিতে পড়তে হবে। এ ছাড়া বেপরোয়া গতির যানবাহনের আধিক্য সড়ক দুর্ঘটনাও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঢাকায় যেহেতু তার ধারাবাধা কোনো কাজ নেই তাই আগেভাগেই নির্বিঘ্নে-নিরাপদে গ্রামের উদ্দেশে রওনা হয়েছেন।
একই কারণে ঈদের এখনো সপ্তাহখানেক বাকি থাকলেও বাড়ির পথে রওনা হয়েছেন তিতুমীর কলেজের ছাত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। তিনি জানান, ঈদের ছুটি শুরু হলে দিনাজপুরে গ্রামের বাড়ি যেতে নানা ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ ছাড়া বাস-ট্রেনের টিকিট পাওয়াও কষ্টকর হয়ে পড়ে। তাই এবার আগেভাগেই গ্রামে ফিরছেন।
এদিকে শুধু সড়ক পথেই নয়, রেলপথেও ঘরমুখো মানুষের চাপ বেড়েছে। ঈদের আগাম টিকিট জোগাড় করতে না পেরে অনেকে আগেভাগেই বাড়ির পথ ধরেছেন।
বৃহস্পতিবার (৪ এপ্রিল) সরেজমিনে কমলাপুর রেলস্টেশনে ঘুরে দেখা গেছে, শিডিউল অনুযায়ী চলাচল করছে ট্রেন। ট্রেনের জন্য প্ল্যাটফর্মে অবস্থান করছেন যাত্রীরা। স্টেশনের গেট দিয়ে টিকিট চেক করেই ঢোকানো হচ্ছে যাত্রীদের। টিকিট ছাড়া অতিরিক্ত কোনো যাত্রী প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না স্টেশনে। তবে সরকারি ও বেসরকারি ছুটি শুরু না হওয়ায় এখনো যাত্রীর চাপ বাড়েনি।
কমলাপুর স্টেশনের বিভাগীয় বাণিজ্যিক কর্মকর্তা শাহ আলম কিরণ বলেন, সকাল থেকে ১২টি আন্তঃনগর ট্রেন ছেড়ে গেছে। ৭ তারিখ থেকে উপচেপড়া ভিড় শুরু হবে। এখন নির্ধারিত মানুষই যাচ্ছেন। ২৫ শতাংশ স্টান্ডিং টিকিটও বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, এখনো আগের ৪২ জোড়া আন্তঃনগর ট্রেনই ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীর চাপ সামলাতে আমাদের ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন থেকে স্পেশাল দুটি ট্রেন ছেড়ে যাবে। আগামী ৭ তারিখ থেকে বিশেষ ৮ ট্রেন চলাচল করবে।
যাত্রীরাও বলছেন, কোনো প্রকার হয়রানি ছাড়াই যাতায়াত করতে পারছেন যাত্রীরা।
কমলাপুর থেকে নির্বিঘ্নে ছাড়ছে ট্রেন, নেই ভোগান্তির অভিযোগ
কুড়িগ্রামগামী যাত্রী নাহিদ নয়ন বলেন, অগ্রিম টিকিট কেটে রেখেছি। বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজ চলে যাচ্ছি। স্টেশনে এবার দালাল ও টিকিট কালোবাজারি নেই। যাত্রীর ও চাপ কম। অনেক সুন্দর পরিবেশে বাড়ি যাচ্ছি।
আরেক যাত্রী অনন্ত কুমার বলেন, আমি ব্যবসা করি। স্ত্রী-বাচ্চাসহ ৪ জন দিনাজপুর যাচ্ছি। বাচ্চাদের নিয়ে শেষ মুহূর্তে যেন ঝামেলা না পোহাতে হয় সেজন্য একটু তাড়াতাড়িই যাচ্ছি।
ঢাকা রেলওয়ে স্টেশনের ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার বলেন, আজ কোনো সিডিউল বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেনি। কোনো ট্রেন দেরিতেও ছাড়েনি। কাল একটি ট্রেন শুধু বিলম্বে ছেড়েছে। প্রতিটি পয়েন্টে আমাদের অতিরিক্ত লোকোমোটিভ রয়েছে। যাত্রীরা সহযোগিতা করলে ঈদযাত্রা ভালো হবে আশা করি।







































